ভাটির চিঠি
দয়াল নাম ভরসা করে আরম্ভ করলাম।
রচনায় দ্বিপদী ছন্দ ধরলাম ॥
ছন্দ যে হলো আমার জীবনের সাথি।
সুর তাল ছন্দে আমি কথার মালা গাঁথি ॥
সুর তাল ছন্দে যখন গান গেয়ে যাই।
আমার মনের কথা ছন্দে বলতে চাই ॥
বৃহত্তর সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলায়।
জন্ম নিয়ে লেগে গেলাম ভবের খেলায় ॥
ইহলোকে সুখ-দুঃখে কাঁদায়-হাসায়।
বসত করি হাওরমাতৃক ভাটি এলাকায় ॥
পল্লীগ্রামে বসত করি উজানধল ঠিকানা।
পোস্ট অফিস ধলবাজারে দিরাই হলো থানা ॥
গরিব কৃষক পরিবারে জন্ম নিলাম।
জন্মগত প্রতিবাদী আমি ছিলাম ॥
তেরশো বাইশ বাংলায় জন্ম আমার।
মা বলেছেন ফাল্গন মাসের প্রথম মঙ্গলবার ॥
পিতা-মাতা রেখেছিলেন আবদুল করিম নাম।
জানি না কেন যে বিধি হলো বাম ॥
এই দুঃখ কার কাছে কী বলি বলো না।
ইশকুলে লেখাপড়া করা মোর হলো না ॥
সমাজ ব্যবস্থা আমার পক্ষে ছিল না।
তাই তো আমার খবর কেউ যে নিল না ॥
এই ভবে লক্ষ লক্ষ করিম জন্ম নিল।
এ ব্যবস্থা তাদেরেও নিঃস্ব করে দিল ॥
ভাটি অঞ্চলে হলো আমার জন্মস্থান।
গাই সদা জনগণের সুখ-দুঃখের গান ॥
বাউলরেশে এই দেশে কত গান গেয়েছি।
মানুষের ভালোবাসা-আশীবাদ পেয়েছি ॥
ভাটির চিঠি লিখবো বলে মনে যখন চায়।
মনের কথা প্রকাশ করি গ্রামের ভাষায় ॥
জ্ঞানী গুণী সুধীসমাজ যারা গণ্যমান্য।
তুলে ধরি সকলের অবগতির জন্য ॥
জন্ম নিয়ে এই অঞ্চলের খবর শুনলাম।
পূর্বে এখানে সাগর ছিল কালীদহ নাম ॥
নৌকা কুন্দা বাইয়া মানুষ করত আসা যাওয়া।
লোকে বলে, ছিল তখন লাউড়ে-গৌড়ে খেওয়া ॥
আকাশ হতে পাহাড়েতে নামে যখন ঢল।
পলি মাটি সঙ্গে নিয়ে নিচে নামে জল ॥
পাহাড়ি পলিমটি নিচে এসে পড়ে।
সাগরের তলদেশ ধীরে ধীরে ভরে ॥
জানি না কত দিনে ভরাট হয়েছে।
এখনো মধ্যে মধ্যে গভীর রয়েছে ॥
সাগর ভরাট হয়ে হইল জঙ্গল।
কৃষক মজুরের শ্রমে হইল মঙ্গল ॥
জীবিকা নির্বাহের জন্য কৃষক মজুরগণ।
জঙ্গল কাটিয়া করে বসতি স্থাপন ॥
উঁচু জয়গাগুলোতে হলো গ্রাম-ঘর।
নিচু স্থানগুলোর নাম হইল হাওর ॥
গ্রামের কাছে নিচু জায়গার নাম হয় ঝিল।
গভীর জলাশয়গুলোর নাম হয়েছে বিল ॥
ভরাট অঞ্চলে হলো হাজার হাজার গ্রাম।
ভাটি দেশ বলে হলো এই এলাকার নাম ॥
হবিগঞ্জ সুনামগঞ্জ জেলার ষোলোআনা।
নেত্রকোনা কিশোরগঞ্জ নিয়ে সীমানা ॥
ব্রাম্মণবাড়িয়া জেলা সঙ্গে রয়েছে।
পাঁচটি জেলার সমন্বয়ে ভাটি দেশ হয়েছে ॥
জঙ্গল কেটে আবাদ করে মেহনতি সকল।
যেখানে ফলে আজ সোনালি ফসল ॥
পলি মাটি এলাকায় মাটিতে রয় বল।
কৃষকে জমিতে পাইত ভালো ফল ॥
বসত করে কৃষক মজুর হিন্দু-মুসলমান।
এই এলাকা হয় খাদ্য উৎপাদনের স্থান ॥
বন্যার জলে ফসল নিলে কেউ কাঁদে কেউ হাসে।
সুনামগঞ্জবাসী কাঁদে পড়ে পূর্ণগ্রাসে ॥
পল্লীগ্রামে বসত করি কী অবস্থায় চলি।
এলাকার সুখ-দুঃখের খবর এখন বলি ॥
আমি বলি আমার ভাবে আমি যাহা বুঝি।
দুঃখে গড়া জীবন নিয়ে মুক্তির পথ খুঁজি ॥
মনে ভাবি শিক্ষাসম্পদ নাই যে আমার।
করতে চাই না আকাশের নক্ষত্র বিচার ॥
প্রয়োজনে ভাটির চিঠি লিখতে যখন বসি।
ভাবি, আঁধারে কবে উদয় হবে শশী ॥
Discussion
Public comments for Bhatir Chithi are available on the discussion page.
View discussion